অলংকার কাকে বলে কত প্রকার ও কি কি? বিস্তারিত...

মানুষ স্বভাব বশত: সুন্দরের পূজারি। যে কোন সৌন্দর্যই আমাদের হৃদয়কে আন্দোলিত করে, বিমোহিত করে, হোক তা কিছু সময়ের জন্য। প্রকৃতিতে ছড়ানো ছিটানো নানা সৌন্দর্য যেমনি আমাদের মুগ্ধ করে, আমরাও যেভাবে নিজেদের রূপ সৌন্দর্য অন্যের কাছে তুলে ধরতে প্রসাধনীর আশ্রয় নেই বিশেষ করে নারীরা নানা অলঙ্কারে তার রূপ যেভাবে প্রকাশ করে থাকেন তেমনি সাহিত্যে বিশেষ করে কবিতায় সে সৌন্দর্যকে তুলে ধরতে হলে অলঙ্কারের ব্যবহার অত্যাবশ্যকীয়; যার মাধ্যমে একটি কবিতা অলঙ্কারের আচ্ছাদনে আচ্ছাদিত হয়ে তার শিল্পিত রূপ এবং নান্দনিকতাকে ফুটিয়ে তুলে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে।

আমরা যারা বাংলা সাহিত্যের পাঠক তাদের এ অলঙ্কার গুলো মোটামুটি ভাবে জানা থাকলে সাহিত্যের প্রকৃত সৌন্দর্য, শিল্প, নান্দনিকতা খুঁজে পেতে কষ্ট হবে না। বরং এগুলো জানা থাকলে গল্প, কবিতা, উপন্যাসের প্রকৃত মর্ম উদ্ধার করতে পারবো আমাদের পাঠক মানসে। বাংলা প্রধান দুই অলঙ্কারের প্রধান প্রধান অলঙ্কার গুলো নিয়ে আমার ব্যক্তিগত পাঠ বা অনুশীলন সবার সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করলাম। আশা করি কেউ কেউ এর থেকে উপকৃত হবেন।
বাংলা অলঙ্কার প্রধানত দুই প্রকার:
১.শব্দালঙ্কার
২.অর্থালঙ্কার।
এছাড়া আরও কিছু অপ্রধান অলঙ্কার রয়েছে যেমন: বিরোধমূলক অলঙ্কার, শৃঙ্খলামূলক অলঙ্কার,
ন্যায়মূলক অলঙ্কার, গূঢ়ার্থমূলক অলঙ্কার ইত্যাদি।
শব্দালঙ্কার:
শব্দের ধ্বনিরূপকে আশ্রয় করে যে অলঙ্কারের সৃষ্টি হয় তাকে বলা হয় শব্দালঙ্কার। অর্থাৎ শব্দকে ঘিরে এ
অলঙ্কারের সৃষ্টি। এর মূল সৌন্দর্য টুকু ফুটে উঠে শব্দের ধ্বনিরূপে। মনে রাখতে হবে শব্দালঙ্কারের অলঙ্কার
নির্ভর করে শব্দের ওপর। তাই ইচ্ছে মতো তাকে বদলে দেয়া যায় না।
প্রধান কয়েকটি শব্দালঙ্কার:
শব্দালঙ্কারের সংখ্যা কম নয়, তবে বাংলায় ব্যবহার উপযোগিতার দিক দিয়ে প্রধান হচ্ছে চারটি।
১.অনুপ্রাস(ধ্বনি বা বর্ণের বারবার আসা)
২.যমক(একই শব্দের বারবার উল্লেখ,ভিন্নার্থে ব্যাবহার)
৩.শ্লেষ(একই শব্দের একবার উল্লেখ,দুইটি অর্থে ব্যাবহার)
৪.বক্রোক্তি(বক্তা এক বলবে শ্রোতা অন্যটা বুঝবে)
১.অনুপ্রাস:
অনু শব্দের অর্থ পরে বা পিছনে আর প্রাস শব্দের অর্থ বিন্যাস, প্রয়োগ বা নিক্ষেপ। একই ধ্বনি বা ধ্বনি
গুচ্ছের একাধিক বার ব্যবহারের ফলে যে সুন্দর ধ্বনিসাম্যের সৃষ্টি হয় তার নাম অনুপ্রাস।
এর মূল বৈশিষ্ট্য গুলো হল:
এতে একই ধ্বনি বা ধ্বনি গুচ্ছ একাধিক বার ব্যবহৃত হবে।
একাধিক বার ব্যবহৃত ধ্বনি বা ধ্বনি গুচ্ছ যুক্ত শব্দগুলো যথাসম্ভব পরপর বা কাছাকাছি বসবে।
এর ফলে সৃষ্টি হবে একটি সুন্দর ধ্বনি সৌন্দর্যের।
অনুপ্রাস প্রধানত তিন প্রকার।
অন্ত্যানুপ্রাস, বৃত্ত্যনুপ্রাস এবং ছেকানুপ্রাস।
অন্ত্যানুপ্রাস:
কবিতার এক চরণের শেষে যে শব্দধ্বনি থাকে অন্য চরণের শেষে তারই পুনরাবৃ্ত্তিতে যে অনুপ্রাস অলঙ্কারের
সৃষ্টি হয় তার নাম অন্ত্যানুপ্রাস। অর্থাৎ কবিতার দুটি চরণের শেষে যে শব্দধ্বনির মিল থাকে তাকেই
অন্ত্যানুপ্রাস বলে। একে অন্ত্যমিলও বলা হয়ে থাকে।
যেমন: কাণ্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি মাল্লা,
দাড়ি মুখে সারি গান লা-শরীক আল্লাহ।
বৃত্তানুপ্রাস:
একটি ব্যঞ্জনধ্বনি একাধিকবার ধ্বনিত হলে, বর্ণগুচ্ছ স্বরূপ অথবা ক্রম অনুসারে বহুবার ধ্বনিত হলে যে
অনুপ্রাসের সৃষ্টি হয় তাকে বলা হয় বৃত্ত্যনুপ্রাস।
যেমন: কাক কালো কোকিল কালো কালো কন্যার কেশ।
ছেকানুপ্রাস:
দুই বা ততোধিক ব্যঞ্জনধ্বনি যুক্ত বা বিযুক্ত ভাবে একইক্রমে মাত্র দুবার ধ্বনিত হলে যে অলঙ্কারের সৃষ্টি হয়
তার নাম ছেকানুপ্রাস। একে শ্রুত্যনুপ্রাস, লাটানুপ্রাস, মালানুপ্রাস, গুচ্ছানুপ্রাস, আদ্যানুপ্রাস বা সর্বানুপ্রাস
হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। মনে রাখা দরকার যে একক ব্যঞ্জনে কোন ক্রমেই ছেকানুপ্রাস হয় না।
উল্লেখ্য যে, এ ধরণের অনুপ্রাসের বাস্তব ব্যবহার বাংলায় খুব বেশি দেখা যায় না।
যেমন:
অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে? (সুধীনদত্ত)
২.যমক:
একই শব্দ একই স্বরধ্বনিসমেত একই ক্রমে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে একাধিক বার ব্যবহারের ফলে যে অলঙ্কারের
সৃষ্টি হয় তার নাম যমক। যমক শব্দের অর্থ হল যুগ্ম বা দুই। লক্ষনীয় যে, একই শব্দ দুই বা ততোধিক বার
ব্যবহৃত হওয়া এবং ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করা এর বৈশিষ্ট্য।
যমক তিন প্রকার। যথা:
১.আদ্যযমক: চরণের শুরুতে যমক থাকলে তা আদ্য যমক।যেমন:
ভারত ভারতখ্যাত আপনার গুণে।(ভারতচন্দ্র)
২.মধ্যযমক:  মাঝে থাকলে তা মধ্য যমক।যেমন: তোসার এ বিধি,বিধি, কে পারে বুঝিতে।(মধুসূ)
৩.অন্তযমক: শেষে থাকলে তা অন্ত্য যমক হয়। যেমন:
কবির রমণী বাঁধি কেশপাশ
বসি একাকিনী বাতায়ন পাশ।(রবি)
৩.শ্লেষ:
একটি শব্দ একাধিক অর্থে একবার মাত্র ব্যবহারের ফলে যে অলঙ্কারের সৃষ্টি হয় তার নাম শ্লেষ। শ্লেষ শব্দের অর্থ শ্লিষ্ট-মিলিত বা আলিঙ্গিত। এতে একবার মাত্রই শব্দটি ব্যবহৃত হয় কিন্তু তাতে ভিন্ন অর্থের ব্যঞ্জনা থাকে। এই শ্লেষ শব্দকেন্দ্রিক বলে কেউ কেউ একে শব্দ-শ্লেষ বলেন।যেমন:

শ্লেষকে কেউ কেউ দুই ভাগে ভাগ করে থাকেন। যথা
১.অভঙ্গ শ্লেষ: শব্দকে না ভেঙ্গে অখণ্ড অবস্থায় রেখেই যে শ্লেষ প্রকাশ পায় তা-ই অভঙ্গ শ্লেষ।যেমন:
মাথার উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে (নজরুল)
এখানে কবি রবি' বলতে সূর্য ও রবীন্দ্রনাথকে বুঝিয়েছেন।
২.সভঙ্গ শ্লেষ: অখণ্ড অবস্থায় শব্দের শ্লেষ প্রকাশ না পেয়ে শব্দকে ভাঙ্গলে যে শ্লেষ প্রকাশ পায় তার নাম
সভঙ্গ শ্লেষ। যেমন:
শ্রীচরণেষু
শ্রীচরণেষুএকটা জুতোর দোকানের নাম। ক্রেতার শ্রীচরণ ভরসা করে জুতোর দোকানদারকে জীবনযাত্রা
নির্বাহ করতে হয়, তাই শ্রীচরণ শব্দের শেষে সপ্তমীর বহুচবন যুক্ত করে শ্রীচরণেষুব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু
শব্দটা ভাঙলে আরো গভীর তাৎপর্য উদ্ঘাটিত হয়- অর্থাৎ শ্রীচরণে ষু’(shoe বা জুতো পরার আহ্ববান), যা
শব্দ ভাঙায় পাওয়া গেল।
৪.বক্রোক্তি:
বক্রোক্তি এর অর্থ বাঁকা কথা।বক্তা বা প্রশ্নকারী যদি কোনো কথাকে বিশেষ অর্থে ব্যবহার করেন --- অথচ
শ্রোতা বা উত্তরদাতা সে অর্থ গ্রহণ না করে কথাটিকে ভিন্ন অর্থে গ্রহণ করেন কিংবা সে অনুসারে উত্তর দেন,
তবে সেখানে বক্রোক্তি অলংকার হয়।যেমন:
বক্রোক্তি দুই প্রকারের।
১. শ্লেষবক্রোক্তি। যেমন:
আপনার ভাগ্যে রাজানুগ্রহ আছে
---তিন মাস জেল খেটেছি ; আর কতদিন খাটব।
২.কাকু-বক্রোক্তি। যেমন:
আমি কি ডরাই, সখি,ভিখারি রাঘবে? রচনায় ও সম্পাদনায় জহির উদ্দীন বি.এ (অনার্স) এম.এ (বাংলা) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষক,বি এ এফ শাহীন কলেজ চট্টগ্রাম।

1/Post a Comment/Comments

Post a Comment